NAMSAA  •  নেপথ্যের গল্প  •  ২৫ আগস্ট ২০২৬

এক বাস, একষট্টি জন—আর এক দুরন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাস

এক মাসের আলোচনা, অঙ্ক কষা, ফোনকল, বৃষ্টির পূর্বাভাস—আর শেষ পর্যন্ত বিরিয়ানি। এভাবেই একটি পরিকল্পনা হয়ে উঠেছিল আনন্দময় এক দিনের বিজ্ঞানভ্রমণ।

সায়েন্স সিটি ভ্রমণে ছাত্র, শিক্ষক ও নামসার স্বেচ্ছাসেবকদের দল
সায়েন্স সিটিতে ছাত্র, শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবকদের দল। ছবি দেখতে না পেলে ব্রাউজারে দেখুন

ছবিতে দেখা যায় হাসিমুখ, উৎসাহী ছাত্র আর সায়েন্স সিটিতে কাটানো একটি সফল দিন। ছবিতে যা দেখা যায় না, তা হলো—প্রায় এক মাস ধরে চলা আলোচনা, হিসাব-নিকাশ, ফোনকল, তারিখ নিয়ে টানাপোড়েন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে লড়াই এবং অবশ্যই কিছু নির্ভেজাল হাসি-ঠাট্টা।

এই হলো সেই নেপথ্যের গল্প।

৪৮
ছাত্র
শিক্ষক
স্বেচ্ছাসেবক
ছাত্রদল

শুরু হয়েছিল এক লম্বা তালিকা দিয়ে

২৮ জুলাই আলোচনার শুরুতে ছিল দুটি ভাবনা—একটি শিক্ষামূলক বিজ্ঞানভ্রমণ এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্রদের দিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক মডেল উপস্থাপনের সম্ভাবনা।

প্রথম প্রশ্ন ছিল—যাওয়া হবে কোথায়?

তারপর একে একে আসতে শুরু করল নানা প্রস্তাব—বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজিয়াম, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশবিষয়ক সংগ্রহশালা, নেভাল এয়ারক্রাফট মিউজিয়াম, রোবোটিক্স সেন্টার, রিনিউয়েবল এনার্জি মিউজিয়াম, এমনকি আলিপুর জেল মিউজিয়ামও।

শেষ পর্যন্ত সকলের পছন্দের তালিকায় এগিয়ে গেল সায়েন্স সিটি। একই জায়গায় মহাকাশ, জলবায়ু পরিবর্তন, মানব বিবর্তন, প্রতিফলন, নানা ইন্টার‌্যাক্টিভ প্রদর্শনী এবং বিশেষ আকর্ষণ Science on a Sphere—ছাত্রদের সামনে বিজ্ঞানের অনেকগুলি দরজা একসঙ্গে খুলে দেওয়ার সুযোগ এখানে সবচেয়ে বেশি।

ভাবনাটা শুধু এক দিনের আনন্দভ্রমণের ছিল না। আশা ছিল, এই অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে নতুন প্রশ্ন, প্রজেক্ট রিপোর্ট, বিজ্ঞান কুইজ কিংবা মডেল তৈরির উৎসাহ। তবে সে সব পরের কথা। তার আগে ভ্রমণটিকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে!

সায়েন্স সিটির একটি দৃশ্য
বিজ্ঞানের নানা জগতকে এক ছাদের নীচে এনে দেয় সায়েন্স সিটি। ছবি দেখতে না পেলে ব্রাউজারে দেখুন

ভ্রমণ আয়োজনের ‘রোমাঞ্চকর’ জীবন

প্রতিটি হাসিখুশি গ্রুপ ছবির আড়ালে থাকে মোটেই ছবির মতো সুন্দর নয়—এমন একটি দীর্ঘ তালিকা:

কোন দিন স্কুলের সময়সূচির সঙ্গে মিলবে?
নবম না দশম—কোন শ্রেণির ছাত্ররা যাবে?
সরকারি বাস, না বেসরকারি বাস?
বাজেটের মধ্যে ৬০ আসনের বাস পাওয়া যাবে তো?
কোন কোন গ্যালারি দেখা হবে?
দুপুরে সবাই কী খাবে?
আর প্রায় পঞ্চাশজন উৎসাহী ছাত্রকে সামলাবেন কারা?

স্কুলের পরীক্ষা, ছুটি এবং নামসার অন্যান্য কর্মসূচি মিলিয়ে সম্ভাব্য তারিখ খোঁজা হলো। স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হলো। বাসের খোঁজ শুরু হলো। কোন কোন প্রদর্শনী দেখা হবে এবং তার জন্য কত টাকা লাগবে—তারও খুঁটিনাটি হিসাব তৈরি হলো।

৬ আগস্টের মধ্যে পরিকল্পনা অনেকটাই স্পষ্ট। ছাত্ররা দেখবে 3D Space Theatre, Science on a Sphere, Science Exploration Hall এবং Climate Change Gallery-সহ সায়েন্স সিটির বিভিন্ন আকর্ষণ।

খরচের প্রশ্নেও সহযোগিতার হাতের অভাব হলো না। বাস, টিকিট, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহন করতে নামসার বহু সদস্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এলেন। মিলন দাশগুপ্ত বাস ও টিকিটের খরচের দায়িত্ব নিলেন; অন্যদের সহযোগিতায় খাবারসহ বাকি প্রয়োজনগুলিরও ব্যবস্থা হলো। পাশাপাশি দলের সদস্যরা ব্যস্ত রইলেন অনুমতি, স্বেচ্ছাসেবক এবং অসংখ্য ছোটখাটো বিষয় নিয়ে।

কারণ, একটি ভ্রমণ সফল হয় সকলের সহযোগিতায়—অর্থের সংস্থান থেকে অনুমতি, যোগাযোগ, খাবার, নিরাপত্তা এবং অসংখ্য ছোট কাজ ঠিকমতো সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে।

তারপর আয়োজক কমিটিতে যোগ দিল আবহাওয়ার অ্যাপগুলি।

বৃষ্টির উপকাহিনি

আগস্টের মাঝামাঝি ভ্রমণের তারিখ চূড়ান্ত হলো—২৫ আগস্ট। তারপর শুরু হলো বৃষ্টি।

ভ্রমণের সপ্তাহের গোড়ায় প্রবল বর্ষণ এবং একের পর এক আবহাওয়ার অ্যাপে বৃষ্টির পূর্বাভাস গোটা পরিকল্পনাটিকেই অনিশ্চিত করে তুলল। কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতির পর হঠাৎ প্রশ্ন উঠল—ভ্রমণ কি পিছিয়ে দিতে হবে?

আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখা হলো। স্কুলকে পরিস্থিতি জানানো হলো। আলোচনা চলতে থাকল।

তারপর পরিস্থিতি আবার বদলাল। ২৫ আগস্টের তারিখটি টিকে গেল। ঠিক হলো, সকাল সাড়ে দশটায় বাস ছাড়বে। যে পরিকল্পনা কয়েক দিন আগেও বৃষ্টির জলে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কায় ছিল, সেটিই আবার রাস্তায় নামার জন্য প্রস্তুত।

ছয়টি দল এবং অনেকগুলি সতর্ক চোখ

শেষ পর্যন্ত ভ্রমণে অংশ নিল নবম শ্রেণির ৪৮ জন ছাত্র এবং স্কুলের সাতজন শিক্ষক।

এতজন ছাত্রকে একসঙ্গে একটি বড় ভিড় হিসেবে না নিয়ে, তাদের ভাগ করা হলো ছয়টি দলে। প্রতিটি দলের নাম রাখা হলো একজন বিজ্ঞানীর নামে। ব্যবস্থাটি যেমন কাজের, তেমনই তার মধ্যে ছিল বিজ্ঞানের ছোঁয়া।

নামসার পক্ষ থেকে সঙ্গে গেলেন ছয়জন স্বেচ্ছাসেবক। ইয়ং ব্রিগেড থেকে ছিলেন আবেন, দেবায়ন ও তন্ময়। সিনিয়র টিম থেকে ছিলেন মিলন দাশগুপ্ত, সুমিত রায় ও বিশ্বজিৎ বসু

তাঁদের কাজ শুধু ছাত্রদের একসঙ্গে রাখা নয়। ছাত্রদের কৌতূহল, শৃঙ্খলা, দলবদ্ধভাবে চলার মানসিকতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার দিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিজ্ঞানভিত্তিক কুইজ আয়োজনের জন্য প্রশ্ন ও বিষয় সংগ্রহের ভাবনাও ছিল।

বাস্তবে অবশ্য এর অর্থ—বারবার মাথা গোনা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, ঘড়ির দিকে নজর রাখা, এক প্রদর্শনী থেকে অন্য প্রদর্শনীতে দলগুলিকে নিয়ে যাওয়া এবং মাঝেমধ্যে নিজেদেরও মনে করিয়ে দেওয়া যে তাঁরা সায়েন্স সিটি দেখতে এসেছেন!

তারপর গল্পে প্রবেশ করল বিরিয়ানি

দলটি সময়মতো সায়েন্স সিটিতে পৌঁছল। প্রথম পর্বে বেশ কয়েকটি শো এবং প্রদর্শনী দেখা হলো।

তারপর এলো দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—বিরিয়ানি সহযোগে দুপুরের খাওয়া শেষ, সকলের শক্তি ফিরে এসেছে, এবার দ্বিতীয় পর্ব শুরু!

‘নামসা মুক্ত মঞ্চ’ WhatsApp গ্রুপে এই নিরীহ সংবাদটি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের উত্তেজনা তৈরি করল।

একজন আক্ষেপ করলেন, বিরিয়ানিটা মিস হয়ে গেল। আরেকজন ঘোষণা করলেন, পরের কর্মসূচিতে তাঁকে না নিয়ে গেলে নামসা অফিসের সামনে মঞ্চ তৈরি করে অনশনে বসবেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি একজন সমর্থকও পেয়ে গেলেন।

সফল নেপথ্য-আয়োজনেরও বিপদ আছে। ছবি দেখার পর—আর বিরিয়ানির কথা শোনার পর—পরের কর্মসূচিতে সবাই যেতে চায়!

সায়েন্স সিটির আরও একটি দৃশ্য
আনন্দের ফাঁকেই চলেছে দেখা, জানা আর নতুন প্রশ্নের খোঁজ। ছবি দেখতে না পেলে ব্রাউজারে দেখুন

দিনের সবচেয়ে নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ কাজ

গ্যালারি দেখা, শো, দল সামলানো, প্রশ্ন, দুপুরের খাবার এবং ফেরার যাত্রা—সবকিছুর শেষে বাকি ছিল দিনের শেষ দায়িত্ব। অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক ছাত্রকে নিরাপদে তার অভিভাবকের হাতে তুলে দেওয়া হলো।

কোনও নাটকীয় বিপত্তি ঘটেনি। একষট্টিজনকে নিয়ে একটি দিনের কর্মসূচিতে সেটি শুধু সৌভাগ্যের ফল নয়। তার পিছনে ছিল সতর্ক পরিকল্পনা, নিরন্তর যোগাযোগ এবং প্রয়োজনের সময় প্রত্যেকের নিজের দায়িত্বটুকু ঠিকমতো পালন করা।

তারিখ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আবহাওয়া অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাস খুঁজতে হয়েছে। খরচের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ছয়টি দলকে একটি ব্যস্ত জনসমাগমের মধ্যে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে।

তারপরও গোটা কর্মসূচি পরিকল্পনামতো এগিয়েছে। ছাত্ররা আনন্দ করেছে। সবাই নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে। ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল গল্পটি সম্ভবত এটাই।

কৃতজ্ঞতা

এই শিক্ষামূলক ভ্রমণ সফল করার জন্য নামসার পক্ষ থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ, সঙ্গে যাওয়া সাতজন শিক্ষক, অংশগ্রহণকারী ৪৮ জন ছাত্র, ইয়ং ব্রিগেড ও সিনিয়র টিমের স্বেচ্ছাসেবক, পৃষ্ঠপোষক, আয়োজক এবং পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কাজে যুক্ত প্রত্যেককে আন্তরিক ধন্যবাদ।

একটি সফল শিক্ষামূলক ভ্রমণ হয়তো মাত্র এক দিনের।
এই আয়োজনের দায়িত্বে ছিল নামসার Academic and Welfare Subcommittee। উপসমিতির প্রধান দীপঙ্কর ঘোষ পর্দার আড়াল থেকে সমগ্র পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে তত্ত্বাবধান করেছেন, আর বিশ্বজিৎ বসু সামনে থেকে কর্মসূচির বাস্তবায়ন সামলেছেন—সকলের আন্তরিক সহযোগিতায়।

NAMSAA New Alipore Multipurpose School Alumni Association